ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে ইসলামি  গানের অনন্য ইতিহাস

ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে ইসলামি গানের অনন্য ইতিহাস

By Alamgir kabir

ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে: মাত্র আধা ঘণ্টায় রচিত কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম ইসলামি গানের অনন্য ইতিহাস

রমজান শেষ হতে না হতেই বাংলার আকাশ-বাতাসে যে সুরটি বেজে ওঠে এবং 

প্রতিটি বাঙালির মনে আনন্দের হিল্লোল জাগায়, তা হলো— “ও মন রমজানের 

ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ”। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত এই গানটি কেবল একটি সঙ্গীত নয়, বরং এটি বাঙালির ঈদ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং এক অনন্য জাতীয় সম্পদ।

গানের পটভূমি ও ইতিহাস:১৯৩০-এর দশকে বাংলায় ইসলামি গানের প্রচলন খুব একটা ছিলোনা  বললেই চলে ; তখন উর্দু কাওয়ালি বেশি জনপ্রিয়। নতুন উদীয়মান শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদ বাংলায় ইসলামি গানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তিনি এই ভাবনা কবির  সাথে শেয়ার করেন।কবি    গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সাল ইনচার্জ ভগবতী বাবুকে জানাতে বলেন।

প্রথমে ভগবতী বাবু রাজি না হলেও আব্বাসউদ্দীনের একাধিক অনুরোধে সম্মতি দেন। এরপর কবি কাজী নজরুল ইসলাম মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যে গানটি রচনা করেন (১৯৩১ সালে)।এটিই কবির প্রথম ইসলামি গান। পরের দিন আরেকটি গান রচনা করেন – “ইসলামের ঐ সওদা লয়ে এলো নবীন সওদাগর”।গানটির রেকর্ডিং হয় রচনার চার দিন পর আব্বাসউদ্দীনের কণ্ঠে। তখন আব্বাসউদ্দীনের বয়স মাত্র ২৩ বছর। রেকর্ড প্রকাশিত হয় ১৯৩২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে (His Master's Voice লেবেল, নম্বর N-4111), 

ঈদুল ফিতরের ঠিক আগে। প্রকাশের পরপরই গানটি তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং বাংলা ইসলামি গানের জোয়ার শুরু করে। এমনকি অনেক হিন্দু শিল্পীও ছদ্মনামে ইসলামি গান গাইতে শুরু করেন।এই গান আব্বাসউদ্দীনকে গণসংগীতশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়।

এই গানের জনপ্রিয়তা কেবল সুরের মূর্ছনায় নয়, বরং এর গভীর আধ্যাত্মিক এবং মানবিক আবেদনে। নজরুল এই গানে ইসলামের সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য চিত্র এঁকেছেন।

"আজ ভুলে যা তোর দোস্ত-দুশমন, হাত মেলাও হাতে,

তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্ব নিখিল ইসলামে মুরিদ।"

কবির এই পঙ্ক্তিগুলো আমাদের শিখিয়ে দেয় যে, ঈদ কেবল উৎসব নয়, বরং এটি ক্ষমা এবং ভালোবাসার এক মহৎ মিলনমেলা।

কাজী নজরুল ইসলামের এই সৃষ্টি বাঙালির ঈদ উদযাপনে এনে দিয়েছে এক অনন্য মাত্রা। ত্যাগের শিক্ষা, গরিবের প্রতি মমতা ,যাকাত, দান, সম্প্রীতি, নামাজ ও তৌহিদের বার্তা আর শত্রুকে আপন করে নেওয়ার যে বার্তা এই গানে আছে, তা আজও আমাদের আদর্শ  সমাজ গঠনে পথ দেখায়। যতদিন ঈদ আসবে, ততদিন এই সুর বাঙালির কানে মধু হয়ে বাজবে।

গানের কথা (পুরাতন বানানরীতিতে, আসল সংস্করণ অনুসারে)

ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ,

তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ।

তোর সোনা-দানা, বালাখানা সব রাহে লিল্লাহ

দে যাকাত, মুর্দা মুসলিমের আজ ভাঙাইতে নিঁদ,

ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।

আজ পড়বি ঈদের নামাজ রে মন সেই সে ঈদগাহে,

যে ময়দানে সব গাজী মুসলিম হয়েছে শহীদ।

ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।

আজ ভুলে যা তোর দোস্ত-দুশমন, হাত মেলাও হাতে,

তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্ব নিখিল ইসলামে মুরিদ।

ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।

যারা জীবন ভরে রাখছে রোজা, নিত্য উপবাসী,

সেই গরীব ইয়াতীম মিসকিনে দে যা কিছু মুফিদ,

ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।

ঢাল হৃদয়ের তোর তশতরীতে শিরনি তৌহিদের,

তোর দাওয়াত কবুল করবেন হজরত হয় মনে উম্মীদ।

ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।

তোরে মারল' ছুঁড়ে জীবন জুড়ে ইট পাথর যারা,

সেই পাথর দিয়ে তোলরে গড়ে প্রেমেরই মসজিদ।

ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ,

আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানী তাগিদ।

 

ঈদ মোবারক! এই গানের মতোই ঈদ সবার জীবনে খুশির আলো ছড়িয়ে দিক🌙✨

 

Alamgir
Written by Alamgir kabir

A software developer experienced in C#, ASP.NET Core, SQL Server, and Azure, with knowledge of Angular and React. He enjoys learning new technologies and sharing practical knowledge through teaching and blogging.

Comments

Loading comments...